নামাযে কুরআন পাঠ করা জরুরি


Quran

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, কুরআন থেকে যা তোমাদের জন্য সহজ হয় তা পাঠ কর। (ছূরা মুযযাম্মিল: ২০)
সারসংক্ষেপ : এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, নামাযের মধ্যে কুরআনের যে কোন স্থান থেকে পাঠ করা ফরয।

হযরত আবু হুরাইরা রা. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ স. এক গ্রাম্য ব্যক্তিকে নামায শিখাতে গিয়ে বললেন যে, তাকবীরে তাহরিমা বলার পরে কুরআন থেকে যা তোমার জন্য সহজ তা তিলাওয়াত করবে। (বুখারী: ৬২১২) শাব্দিক কিছু তারতম্যসহ এ হাদীসটি মুসলিম, নাসাঈ, আবু দাউদ, ইবনে মাযাহ এবং তিরমিযী শরীফেও বর্ণিত হয়েছে। (জামেউল উসূল - ৩৫৭৮)
সারসংক্ষেপ : এ হাদীস থেকেও প্রমাণিত হয় যে, নামাযের মধ্যে কুরআনের যে কোন স্থান থেকে পাঠ করা ফরয।

নামাযে পাঠিত কুরআন সহীহ-শুদ্ধ হওয়া জরুরি

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: আপনি কুরআন পাঠ করুন তারতীলের সাথে।(ছুরা মুযযাম্মিল:৪)

হযরত আনাস রা. সহীহ সনদে বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ স. টেনে টেনে কিরাত পড়তেন। (বুখারী: ৪৬৭৭)

হযরত উম্মে সালামা রা. থেকে হাসান সনদে বর্ণিত আছে যে, নবী কারীম স.-এর কুরআন পাট ছিলো শব্দে শব্দে সুস্পষ্ট। (তিরমিযী -২৯২৩, নাসাঈ-১০২৫ ও আবু দাউদ-১৪৬৬)

সারসংক্ষেপ : এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, রসূলুল্লাহ স. কুরআনে কারীম টেনে টেনে মদ সহকারে পাঠ করতেন। সুতরাং নামাযে কুরআন পাঠ করার সময় খুব খিয়াল রাখা যেন তিলাওয়াত তারতীলের সাথে হয়। মদ, গুন্না এবং মাখরাজ ঠিক মত উচ্চারণ হয়।

নামাযের জন্য উত্তম পোশাক গ্রহণ করা


uttom_pushak

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: হে বনী আদম! আমি তোমাদের জন্য পোশাক  অবতীর্ণ করেছি যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং অবতীর্ণ করেছি সাজ-সজ্জার বস্ত্র। আর পরহেযগারীর পোশাকই সর্বত্তম। (সূরা আ'রাফ: ২৬)
তিনি আরও ইরশাদ করেন : হে বনী আদম!  তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সুন্দর পোশাক পরিধান করো এবং খাও ও পান করো; তবে অপব্যয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপব্যয়কারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা আ'রাফ: ৩১)
ফায়দা: সূরা আ'রাফ-এর ৩১ নং আয়াতের তাফসীরে ইমাম কুরতুবী রহ. হযরত আবুল ফারাজ রহ.-এর বরাতে বর্ণনা করেন যে, সালাফে সালেহীনগণ মধ্যম ধরনের কাপর ব্যবহার করতেন; যা অত্যন্ত মূল্যবানও নয়, আবার একেবারে নিম্নমানের নয়। আর তাঁর জুমআ ও ঈদের নামায এবং বন্ধু-বান্ধবদের সাথে মুলাকাতের সময় উত্তম কাপড়  পরতেন। তাঁদের নিকটে উত্তম কাপর পড়া অপছন্দনীয় নয়। তবে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বৈরাগ্য ও দরিদ্র প্রকাশের পোশাক পরিধান করা আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধে নালিশ  করার ভাষা সাদৃশ্য; আর তা মাকরুহ।
সারসংক্ষেপ : উক্ত আয়াতদ্বয়ে পোশাককে লজ্জা ঢাকার মাধ্যম হওয়ার পাশাপাশি সাজ-সজ্জা হিসেবেও প্রকাশ করা হয়েছে। সুতরাং নামাযে ব্যবহৃত পোশাকে সাজ-সজ্জা গ্রহণের উপযোগীতা থাকতে হবে। অর্থাৎ, উত্তম পোশাক হতে হবে। অতএব, সতর ঢাকা ছাড়াও অবশিষ্ট শরীর না ঢেকে নামায পড়া অথবা সাজ-সজ্জা পরিপন্থী জীর্ণ-শীর্ণ কাপড়ে নামায পড়া উভয়টাই মাকরূহ হবে।

উত্তম পোশাক হিসেবে নামাযে পাগড়ী ও টুপি ব্যবহার করা

অনুবাদ : হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, হযরত উমার রা. এক ব্যক্তিকে এমন একটি টুপি পরে নামায পড়তে দেখলেন যে টুপির ভিতরের অংশ ছিলো শিয়ালের চামরার তৈরী। (ইবনে আবি শাইবা-৬৫৩৬)

হাদিসের স্তর : সহীহ। এ হাদীসের রাবীগণ সকলেই প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস এবং বুখারী-মুসলিমের রাবী।

সারসংক্ষেপ : এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সাহাবায়ে কিরামের  সময়  টুপি মাথায় দিয়ে নামায পড়ার প্রচলন ছিলো। সুতরাং এটা নামাযের আদব বা মুস্তহাব।

অনুবাদ : হযরত হিলাল বিন ইয়াসাফ রহ. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ওয়াবেসা রা.কে দুই কান বিশিষ্ট টুপি মাথায় দিয়ে নামায পড়তে দেখেছেন। (আবু দাউদ-৯৪৮)

সারসংক্ষেপ : এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, রসূল স.-এর সাহাবা টুপি মাথায় দিয়ে নামায পড়েছেন। সুতরাং টুপি মাথায় দিয়ে নামায পড়া মুস্তাহাব।
হযরত মুগিরা বিন শ্ত'বা রা. থেকে বর্ণিত আছে যে রসূল সংকীর্ণ হাতাওয়ালা জামা এবং পাগড়ী পরিহীত অবস্হায় অযু করলেন এবং নামায আদায় করলেন। (মুসলিম-৫২৬) শাব্দিক কিছু তারতম্যসহ এ হাদীসটি আবু দাউদ, নাসাঈ এবং মুয়াত্তা মালেকেও বর্ণিত হওয়েছে।) (জামেউল উসূল-৩৮৯৮)

সারসংক্ষেপ : উপরোক্ত হাদীসগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে, রসূল স. এবং সাহাবায়ে কিরাম নামাযে টুপি এবং পাগড়ী ব্যবহার করতেন। অযুর সময় পাগড়ী মাথায় থাকা থেকে আরও প্রমাণিত হয় যে, নামাযের পূর্ব থেকে রসূল স.-এর মাথায় পাগড়ী বাঁধা ছিলো। শুধু নামাযের জন্য বাঁধেননি। অতএব, উত্তম পোষাক হিসেবে পাগড়ী পরা এবং সে পাগড়ী নিয়ে নামায পড়া ছুন্নাত।

ফায়দা : পাগড়ী উত্তম পোশাকের আওতাভুক্ত। আর পূর্বের অধ্যায়ে বর্ণিত সূরা আ'রাফের ৩১ নং আয়াত দ্বারা প্রমাণিত যে, উত্তম পোশাকে নামায পড়া ছুন্নাত। অনুুরূপভাবে টুপিও পোশাকের ছুন্নাত। শুধু নামাযের জন্য টুপি ব্যবহার করতে হবে এমন নয়। বরং পোশাক হিসেবে যেমনিভাবে জামা, পাজামা, লুঈি, গেঞ্জী, রোমাল এবং অন্যান্য কাপড় চোপড় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তেমনিভাবে টুপি ব্যবহার করাও পোশাকের আওতাভুক্ত।
এর বিপরিতে কোন কোন হাদীসে পাগড়ীসহ নামাযকে বিনা পাগড়ীর নামাযের চেয়ে অনেক গুণ ফজিলতওয়ালা বলা হয়েছে। যেমন পাগড়ীসহ একটি নামায পাগড়ীবিহীন পঁচিশটি নামাযের চেয়ে উত্তম এবং পাগড়ীসহ  একটি জুমা পাগড়ীবিহীন সত্তরটি জুমার চেয়ে উত্তম। আল্লামা নূরুদ্দীন কানানী রহ. তান্ ঝীহুশ শরীআ'তিল মারফুআ'হ আ'নিল আখবারিশ শানিআ'তিল মাউযুআ'হ কিতাবের ১৩৯ নম্বর হাদীসে এটাকে মাউযু' বা জাল হাদীস বলেছেন।
অনুরূপভাবে আল্লামা মুল্লা আলী কারী রহ. আল মাউযুআ'তুছ ছুগরা কিতাবে এটাকে মাউযু' হাদীস বলেছেন। তিনি আরও বলেন, আল্লামা মানুফী বহ. এ জাতীয় সবগুলিকে বাতিল বলেছেন। (আল মাউযুআ'তুছ ছুগরা, হাদীস নং-১৭৭) অতএব, পাগড়ী এবং টুপি পরে নামায পড়া দরকার। তবে এটাকে নামাযের ছুন্নাত হিসেবে বিশ্বাস না করে পোশাকের ছুন্নাত হিসেবে বিশ্বাস করা উচিত। এমন কাজ থেকেও বিরত থাকা চাই যা দ্বারা সাধারণ মানুষ এটাকে নামাযের সুন্নাত মনে করে। যেমন ইকামাতের সময় পাগড়ী বাঁধা আবার সালাম ফিরিয়ে পাগড়ী খুলে রাখা। অনুুরূপভাবে নামাযের সময় টুপি মাথায় দেয়া আবার নামায শেষ করে টুপি খুলে রাখা ইত্যাদী।

মানুষ চলাচলের সম্ভবনা থাকলে সামনে সুতরা রেখে নামায পড়া


সুতরা ব্যাবহার

হযরত আবু জুহাইম রা. বলেন: আমি রসূলুল্লাহ স.কে বলতে শুনেছি, নামাযীর সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী যদি জানত তার অপরাধ কী পরিমাণ, তাহলে তার নিকটে চল্লিশ বছর পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা নামাযীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করার চেয়ে উত্তম হত। (মুসনাদে বায্ যার-৩৭৮২) শাব্দিক কিছু তারতম্যসহ এ হাদীসটি বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ, তিরমিযী ও ইবনে মাযা শরীফেও বর্ণিত হয়েছে।
হাদীসটির স্তর: সহীহ। এ হাদীসটির রাবীগণ সকলেই বুখারী/মুসলিমের রাবী। আল্লমা হাইসামী বলেন, হাদীসটি বয্ যার বর্ণনা করেছেন এবং এর রাবীগণ সহীহ হাদীসের রাবী। (মাযমাউজ যাওয়ায়েদ-২৩০২)
হযরত সাবরা বিন মা'বাদ রা. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ স. ইরশাদ করেন, তোমাদের কেউ নামায আদায় করার সময় যেন সুতরা বানিয়ে নেয়। যদিও তা তীর দ্বারা হয়। (ইবনে আবি শাইবা-২৮৭৯)
হযরত আয়েশা রা. বলেন: তাবুকের যুদ্ধের সময় রসূলুল্লাহ স.-এর কাছে নামাযীর সামনের সুতরা সম্পর্কে জিঙ্গেস করা হলে তিনি বললেন: তা হলো হাওদার পিছনের খুঁটির ন্যায়। (মুসলিম: ৯৯৬-৯৯৭) শাব্দিক কিছু তারতম্যসহ এ হাদীসটি নাসাঈ শরীফেও বর্ণিত হয়েছে।
হযরত আতা বিন আবি রবাহ রহ. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত আছে যে, 'হাওদার পিছনের খুঁটির পরিমাণ হলো এক হাত বা তার কিছু বেশী। (আবু দাউদ: ৬৮৬)
হযরত সাহল বিন আবু হাছমা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ স. ইরশাদ করেন, যখন তোমাদের কেউ সুতরার দিকে নামায আদায় করবে সে যেন সুতরার এতটা নিকটবর্তী হয়ে দাঁড়ায় যে, শয়তান তার নামায নষ্ট করতে না পারে। (মুসনাদে আহমাদ-১৬১৩৪) এ হাদীসের তাহকীকে শায়খ শুআইব আরনাউত বলেন, হাদীসটির সনদ সহীহ।
সারসংক্ষেপ: উপরোক্ত হাদীসগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে, নামাযের সামনে দিয়ে অতিক্রম করা যেহেতু বড় ধরনের অন্যায় তাই নামাযীকে এটা খেয়াল রাখতে হবে যে, সুতরা বিহীন নামাযে দাঁড়ানোর করণে যেন কেউ এ অন্যায় করতে বাধ্য না হয়। আবু দাউদ শরীফ ৬৮৯ নং হাদীসে বর্ণিত আছে যে, কেউ সুতরা না পেলে যেন লাঠি দাঁড় করে নেয় আর তাও না পেলে যেন সামনে দিয়ে দাগ টেনে নেয়। এর বাইরে দিয়ে কেউ অতিক্রম করলে তার কোন অপরাধ হবে না। সুতরার পরিমাণ হবে এক হাত বা তার বেশী এবং মুসল্লী সুতরার কাছাকাছি দাঁড়াবে।

সালাতুত তাসবীহ


সালাতুত তাসবীহ

হযরত আবু রাফে' রা. থেকে বর্ণিত, রসূল স. হযরত আব্বাস রা.কে এভাবে সালাতুত তাসবীহ শিক্ষা দেন যে, আপনি চার রাকাত নামায পড়বেন; প্রত্যেক রাকাতে ছূরা ফাতেহা এবং অন্য একটি ছূরা পড়বেন। যখন প্রথম রাকাতের কিরাত পড়ে অবসর হবেন তখন দাঁড়িয়ে পনের বার  سُبْحاَنَ الله وَالْحَمدُ للهِ وَلآَ اِلَهَ اِلاَّاللهُ وَاللهُ اَكْبرُ
বলবেন। এর পরে রুকু করবেন এবং  রুকু অবস্থায় দশবার পড়বেন। অতঃপর রুকু হতে মাথা উত্তোলন করবেন এবং দশবার পড়বেন। এর পড় সিজদার জন্য ঝুঁকবেন এবং সিজদারত অবস্থায় দশবার পরবেন। অতঃপর সিজদা হতে মাথা উত্তোলন করবেন এবং দশবার পরবেন। এর পর ২য় সিজদায় দশবার পরবেন। অতঃপর মাথা উত্তোলন করে (দাঁড়ানোর পূর্বে) দশবার পরবেন। এ হলো প্রত্যেক রাকাতে পঁচাত্তর বার। অনুরুপভাবে চার রাকাতে করবেন। রসূল স. বলেন, আপনি পারলে দৈনিক একবার পড়বেন। যদি তা না  পারেন তাহলে সপ্তাহে একবার পড়বেন। যদি তা না পারেন তাহলে মাসে একবার পড়বেন। যদি মাসে একবার না পরেন তাহলে বছরে একবার পড়বেন। যদি তাও না পারেন তাহলে পূর্ণ জীবনে একবার পড়বেন। (আবু দাউদ শরীফ-৪৮২)। শাব্দিক কিছু তারতম্যসহ হাদীসটি নাসাঈ শরীফেও বর্ণিত হয়েছে।
হাদীসটির স্তর :  সহীহ লিগায়রিহী। হাকেম আবু আব্দুল্লাহ বলেন, এ সনদটি স্পষ্ট সহীহ। (মুসতাদরাকে হাকেম-১১৯৬) আবু দাউদ শরীফের তাহকীকে শায়খ শুআইব আরনাউত এবং শায়খ আলবানী উভয়েই হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
সারসংক্ষেপ : এ হাদীস দ্বারা সালাতুত তাসবীহ প্রমাণিত হলো। অতএব, এ নামায আদায় করা উচিত। এ হাদীস বর্ণিত পদ্ধতিতে দ্বিতীয় সিজদা থেকে উঠে দাঁড়ানোর পূর্বে বসে বসে ১০ বার তাসবীহ পড়ার কথা বলা হওয়েছে। প্রথম এবং তৃতীয় রাকাতে এ বৈঠকটির ব্যাপারে হাদীসের বর্ণনা বিভিন্ন রকম হওয়ায় অনেক উলামায়ে কিরামের নিকট এটা অনুত্তম। অবশ্য এ বৈঠক না করে সালাতুত তাসবীহ আদায়ের আরও একটি পদ্ধতি এমনও হতে পারে যে, ছানা পড়ার পরে ছূরায়ে ফাতেহার পূর্বে প্রথম ১৫বার তাসবীহ পড়ে নিবে। আর অবশিষ্ট সকল ক্ষেত্রে ১০বার করে পূর্ববর্ণিত নিয়মে পড়বে। তাহলে দ্বিতীয় সিজদায় ৭৫বার পড়া শেষ হয়ে যাবে। দ্বিতীয় সিজদার পরে আর বসতে হবে না। হযরত আব্দুল্লাহ বিন মুবারক রহ. থেকে এ পদ্ধতি বর্ণিত হওয়েছে। (তিরমিযী : ৪৮১ নং হাদীসের আলোচনায়, মুসতাদরাকে হাকেম:১১৯৭)

পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের প্রকৃত সময়


নামায

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ স. ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয় নামাযের ওয়াক্তের শুরু ও শেষ আছে। যোহরের নামাযের ওয়াক্ত শুরু হয় সূর্য (পশ্চিম আকাশে) ঢোলে পড়লে আর শেষ হয় আসরের ওয়াক্ত এলে। আসরের ওয়াক্ত প্রবেশ করলে তা শুরু হয় আর শেষ হয় সূর্যের কিরণ হলুদ হয়ে গেলে। মাগরিবের ওয়াক্ত শুরু হয় সূর্য ডুবে গেলে আর শেষ হয় পশ্চিম আকাশের আভা চলে গেলে। ইশার ওয়াক্ত শুরু হয় আভা চলে গেলে আর শেষ হয় রাত অর্ধেক হলে। আর ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয় সুবহে সাদিক উদিত হলে আর শেষ হয় সূর্য উঠলে। (তিরমিযী: ১৫১)

হাদীসের স্তর : সহিহ। ইমাম তিরমিযী রহ. হাদীসটির এ সনদের উপর কিছুটা আপত্তি করলেও ভিন্ন সনদে হাদীসটির এ বক্তব্যকে সহীহ বলেছেন। মুসনাদে আহমাদের তাহকীকে শায়খ শুআইব আরনাউত বলেন, হাদীসটির সনদ সহীহ এবং বর্ণনাকারীগণ বুখারী- মুসলিমের বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী। (মুসনাদে আহমাদ -৭১৭২)। শাব্দিক কিছু তারতম্যসহ এ হাদীসটি মুয়াক্তা মালেক এবং নাসাঈ শরীফেও বর্ণিত হয়েছে। (জামেউল উসূল-৩২৭৪)

সারসংক্ষেপ : এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয় সুবহে সাদিক উদিত হলে আর শেষ হয় সূর্য উদয়ের পূর্বক্ষণে। যোহরের ওয়াক্ত শুরু হয় যখন সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পরতে আরম্ভ করে। যোহর শেষ  ও আসর শুরু হওয়ার ব্যাপারে এ হাদীসে পরিষ্কার সিদ্ধান্ত পওয়া যায়নি। তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসছে। এ হাদীসে সূর্যের কিরণ হলুদ হওয়ার সুময়কে আসরের শেষ সময় বলা হয়েছে। তবে এটা আসরের উত্তম ওয়াক্তের শেষ। আর আসরের ওয়াক্ত বাকি থাকে সূর্য ডুবার পূর্ব পর্যন্ত। সামনে তার দলীল আসছে। মাগরিবের ওয়াক্ত শুরু হয় সূর্য ডুবার সাথে সাথে। আর মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হয় সূর্যের আভা নিভে গেলে। ইশার ওয়াক্ত শুরু হয় মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হলে। আর ইশার শেষ ওয়াক্তের ব্যাপারে এ হাদীসে অর্ধরাত্রির কথা বলা হয়েছে। তবে এটা উত্তম ওয়াক্তের শেষ। আর ইশার জায়েয ওয়াক্ত ফজরের পূর্ব পর্যন্ত বাকি থাকে।  সামনে তার দলীল আসছে।

অযু বা গোসলের দ্বারা শরীর পবিত্র করা


পবিত্র

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: হে ঈমানদার গণ! তোমরা যখন নামাযে দাঁড়ানোর ইচ্ছা কর তখন তোমাদের চেহারা ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করো, মাথা মাসেহ করো এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধৌত করো। আর তোমরা যদি জুনুবী হও অর্থাৎ গোসলের প্রয়োজন হয় তাহলে খুব ভালো করে পবিত্রতা অর্জন করো (সুরা মায়েদা: ৬)।
হযরত আবু  হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ স. ইরশাদ করেন: যে ব্যক্তির অযু ভেঙ্গে যাবে অযু না করলে তার নামায কবুল হবে না। (বুখারী:১৩৭) শাব্দিক কিছু তারতম্যসহ এ হাদিসটি মুসলিম, আবু দাউদ এবং তিরমিযী শরীফেও বর্ণিত হয়েছ। (জামেউল উসুল-৫২১৮)
সারসংক্ষেপ : উপরোক্ত আয়াত ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নামাযে দাঁড়ানোর পুর্বে ছোট-বড় সব ধরণের অপবিত্রতা থেকে পবিত্র হওয়া জরুরী।

শরীরের কোথাও নাপাক লেগে থকলে তা পবিত্র করা 

হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমার রা. বলেন, আমি রসুল স. থেকে শুনেছি যে, পবিত্রতা ব্যতীত নামায কবুল হয় না। (মুসলিম-৪২৮) শাব্দিক কিছু তারতম্যসহ এ হাদীসটি তিরমিযী শরীফেও বর্ণিত হয়েছে। (তিরমিযী-১)
সারসংক্ষেপ : এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, পবিত্রতা ব্যতীত আল্লাহ তাআলা নামায কবুল করেন না। শরীর পাক, কাপড় পাক ও নামাযের জায়গা পাকসহ সব ধরণের পবিত্রতার জন্যই এ হাদীসটি দলীল হিসেবে স্বীকৃতি।

কাপড়ে নাপাক লেগে থকলে তা পবিত্র করা

হযরত সাহল বিন হুনাইফ রা. বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার কাপড়ে মাজী লেগে গেলে কি করতে হবে? তিনি বললেন, এক অঞ্জলি পানি নিবে এবং যেখানে লেগেছে বলে মনে করো সেখানে ধুয়ে ফেলবে। (আবু দাউদ-২১০) শাব্দিক কিছু  তারতম্য এ হাদীসটি তিরমিযী -১১৫ এবং ইবনে মাযা শরীফেও বর্ণিত হয়েছে।
হাদীসের স্তর : সহীহ। ইমাম তিরমিযী রহ. এ হাদীসটিকে হাসান-সহীহ বলেছেন।
হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি রসূলুল্লাহ সা.-এর কাপড় থেকে বীর্য ধুয়ে ফেলতেন; আর রসূল স. কাপড়ে ভেজা চিহ্ন নিয়ে নামায আদায় করতে বের হতেন। (বুখারী: ২২৯) শাব্দিক কিছু তারতম্যসহ এ হাদীসটি মুসলিম, আবু দাউদ, ইবনে মাজা এবং নাসাঈ শরীফেও বর্ণিত হয়েছে। (জামেউল উসূল-৫০৬৪)
সারসংক্ষেপ : পূর্বোক্ত হাদীস দুটি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কাপড়ে নাপাক লেগে থকলে তা নিয়ে নামায পড়া যাবে না। বরং অবশ্যই তা ধুয়ে পাক করেই তবে নামায পড়তে হবে। কাপড় পবিত্র করার বিস্তারিত পদ্ধতি ফিকহের কিতাবে দেখে নেয়া যেতে পারে।