রোজা বা সাওমের নিয়ত ও সাহরি-ইফতারের দোয়া

সাওমের নিয়ত
নিয়ত করা ফরজ কিন্তু নিয়ত “পড়া” ফরজ নয়

নিয়ত করার অর্থ হচ্ছে মনে মনে সংকল্প করা। সাওম রাখার জন্য মনে মনে ইচ্ছা করা জরুরি। সেটা মুখে পড়া জরুরি নয়। আমাদের সমাজে যে সকল নিয়ত আরবিতে পাওয়া যায় সেগুলোর কোনোটিই কুরআন-হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। এগুলো কোনো আলেম বা আরবি ভাষায় পারদর্শী ব্যক্তির রচিত। তাই আমরা আমাদের অ্যাপের ইউজারদেরকে এসব থেকে দূরে থেকে সুন্দর সহজ পথ অনুসরণ করার আহ্বান জানাচ্ছি।

আপনি সাহরি খেতে উঠেছেন সেটাই আপনার জন্য নিয়ত। সারা রমজান আপনি সাহরি খেতে পারেন বা না পারেন আপনি সাওম রাখবেন। এমন ইচ্ছা আপনার সাওম শুরু হবার আগেই থাকে। সেক্ষেত্রে এটিই আপনার জন্য নিয়ত। বিভিন্ন ক্যালেন্ডারে যে সকল নিয়তের আরবি বাক্য লিখা থাকে সেগুলো বর্জন করুন।

নাওয়াইতুয়ান আসুম্মা গাদাম্মিন…‌ এই জাতীয় যত নিয়ত আছে এগুলোকে সালাত বা সাওমের জন্য জরুরি বা আবশ্যক মনে করা বিদআত। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেন নি যে এই বাক্যগুলিই পড়তে হবে। তাই আমরা এগুলোকে সাওম বা সালাতের অংশ মনে করে সুনির্দিষ্ট করে নিলে নিশ্চিত এটি হবে আমাদের তরফ থেকে বাড়াবাড়ি। আল্লাহ আমাদেরকে সকল প্রকার বিদআত থেকে রক্ষা করুন।

রেফারেন্সঃ

ইফতারের দুআ


ইফতারের আগে সাওম পালনকারীর দুআ বিফল হয় না

দুআ ১

ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ العُرُوْقُ، وَثَبَتَ الْأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللّٰهُ

পিপাসা মিটেছে, শিরাগুলো সিক্ত হয়েছে এবং আল্লাহ্‌ চান তো সওয়াব সাব্যস্ত হয়েছে।

আবূ দাউদ ২/৩০৬, নং ২৩৫৯। সহীহুল জামে‘ ৪/২০৯

দুআ ২

اللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ بِرَحْمَتِكَ الَّتِيْ وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ أَنْ تَغْفِرَ لِيْ

হে আল্লাহ! আপনার যে রহমত সকল কিছু পরিব্যাপ্ত করে রেখেছে তার উসীলায় আবেদন করি, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।

ইবন মাজাহ্‌ ১/৫৫৭, নং ১৭৫৩; যা মূলত আবদুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমার দো‘আ। আর হাফেয ইবন হাজার তাঁর তাখরীজুল আযকারে এটার সনদকে হাসান বলেছেন। শরহুল আযকার, ৪/৩৪২।

দুআ ৩ (দুর্বল হাদীস হতে প্রাপ্ত)

اللَّهُمَّ اِنِّى لَكَ صُمْتُ وَبِكَ امنْتُ وَ عَلى رِزْقِكَ اَفْطَرْتُ

হে আল্লাহ! আমি তোমার জন্য সাওম রেখেছি এবং তোমার রিজিক দ্বারা ইফতার করছি।

সূত্রঃ আবু দাঊদ – ২৩৫৮। এর সানাদ মুরসাল। এছাড়া সানাদে জাহালাত রয়েছে। এই হাদীসের বর্ণনাকারী মু‘আয বিন যুহরা সম্পর্কে হাফিয বলেনঃ মাক্ববূল।

কোনো পরিবারের মেহমান হয়ে ইফতার করলে তাদের জন্য দুআ


সাওম পালনকারীকে ইফতার করালে তার সমান সওয়াব পাওয়া যায়

أَفْطَرَ عِنْدَكُمُ الصَّائِمُوْنَ، وَأَكَلَ طَعَامَكُمُ الْأَبْرَارُ، وَصَلَّتْ عَلَيْكُمُ الْمَلاَئِكَةُ

আপনাদের কাছে রোযাদাররা ইফতার করুন, আপনাদের খাবার যেন সৎলোকেরা খায়, আর আপনাদের জন্য ফিরিশতারা ক্ষমা প্রার্থনা করুন।

সুনান আবি দাউদ ৩/৩৬৭, নং ৩৮৫৬; ইবন মাজাহ ১/৫৫৬, নং ১৭৪৭; নাসাঈ, আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লাইলাহ, নং ২৯৬-২৯৮। আর সেখানে স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তার পরিবারের কাছে ইফতার করতেন তখন তা বলতেন। আর শাইখ আলবানী তাঁর সহীহ আবি দাউদে একে সহীহ বলেছেন, ২/৭৩০।

রোযাদারকে কেউ গালি দিলে যা বলবে


সাওম অবস্থায় ঝগড়া-বিবাদ ও অশালীন কাজ করা বিশেষ ভাবে নিষেধ

إِنِّيْ صَائِمٌ، إِنِّيْ صَائِمٌ

নিশ্চয় আমি রোযাদার, নিশ্চয় আমি রোযাদার।

বুখারী, (ফাতহুল বারীসহ) ৪/১০৩, নং ১৮৯৪; মুসলিম, ২/৮০৬, নং ১১৫১

লাইলাতুল ক্বদরের দুআ


عَفُوٌّ বলতে এমন ক্ষমাকে বুঝানো হয় যা ক্ষমা করার পাশাপাশি আমলনামা থেকে একেবারে মুছে ফেলা হয়। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন এই ধরনের ক্ষমা করা অপরাধগুলো সমগ্র মানবজাতির সামনে প্রকাশ করা হবে না

اللّٰهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّيْ

হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাকারী, তুমি মাফ করতেই পছন্দ কর, অতএব তুমি আমাকে মাফ করে দাও

সুনান ইবনে মাজাহ, বই ৩৪, হাদিস ২৪

তারাবীহ সালাতের প্রতি চার রাকাতের বিরতিতে পড়ার দুআ


চার রাকাত সালাতের বিরতিতে নির্দিষ্ট কোনো দুআ নাই

আমাদের দেশে অনেক আগে থেকে একটি রেওয়াজ চালু আছে। বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে তারাবীহ সালাতের প্রতি চার রাকাতের পর পুরো মসজিদের সব মুসল্লি একত্রে সুর করে একটি দুআ পড়েন। দুআর শুরুটি এরকমঃ “সুবহানাযিল মুলকে ওয়াল মালাকুতে…”

দুঃখের বিষয় হলো উক্ত দুআটি কুরআন-হাদীসের কোথাও খুঁজে পান নি আলেমগণ। কোনো মুহাদ্দীসই উক্ত দুআটি কোনো হাদীসের কিতাবে আছে বলে জানতে পারেন নি। দুআর কথাগুলো ভালো। কিন্তু এই দুআটি আমরা যেরকম বিশেষ ভাবে তারাবীহ সালাতের প্রতি চার রাকাতের পর পড়াকে অনেক ফজিলতের বা একে তারাবীহ সালাতের দুআ বলে জানি। আল্লাহর রাসূল (সা) আমাদেরকে তা শিক্ষা দেন নি। কোনো সাহাবী এই দুআ পড়েছেন বলে জানা যায় না।

তাহলে এই দুআ কোথা থেকে আসলো? সালাতের নিয়তের আরবি বাক্যগুলোর মত এই দুআটিও কোনো আলেম বা আরবি ভাষা জানেন এমন ব্যক্তি বানিয়েছেন। এর মাঝের অনেকগুলো শব্দ বা বাক্য অন্য কোনো দুআর অংশ হিসাবে পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে পূর্ণাঙ্গ যেই দুআটি পড়া হয় তার অস্তিত্ব কুরআন-হাদীসে পাওয়া যায় না। তাই এই দুআকে তারাবীহ সালাতের প্রতি চার রাকাতে পড়াকে সুন্নত মনে করলে বা বিশেষ ফজিলতের মনে করলে তা বিদআত বলে গণ্য হবে। আল্লাহর রাসূল (সা) আমাদেরকে অনেক অনেক দুআ শিক্ষা দিয়েছেন। তাহলে কেন আমরা এমন দুআ পড়ব যা রাসূলের (সা) থেকে আসে নি? আমরা যুক্তি দিয়ে, একগুয়েমী করে কেন দলীল দিব আমাদের পূর্ব পুরুষেরা পড়ে গেছেন তাই আমাদেরও পড়তে হবে? সহীহ হাদীস দ্বারা যেই পরিমাণ দুআ প্রমাণিত সেগুলো শিক্ষা করতেই তো আমাদের জীবন পার হয়ে যাবে। তাহলে কেন এমন বাক্যগুলো মুখে আউড়াবো যেগুলোর ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল (সা) কোনো সার্টিফিকেট দেন নাই?

তারাবীহ সালাতের প্রতি চার রাকাতের মাঝে বিরতি দেয়া হয়। এই বিরতি দেয়াকে বলে তারাবীহ। এই বিরতির সময় আমরা যে কোনো যিক‍্‍র করতে পারি। ইস্তেগফার করতে পারি। দরূদ পড়তে পারি। যে কোনো মাসনূন দুআ (সুন্নাহ নির্দেশিত দুআ) পড়তে পারি। অথবা চাইলে চুপ করে বসে থেকে রেস্টও নিতে পারি। সাথে করে খাবার, পানি, চা-কফি নিয়ে গেলে এই বিরতিতে এগুলো খেতে পারি। এই বিরতি মূলত বিশ্রামের জন্য। এই বিশ্রামের সময়টাও আমরা আল্লাহর স্মরণে থাকতে পারলে আমাদেরই লাভ। তাই আসুন আমরা হাদীসে উল্লেখ আছে এমন যে কোনো দুআ ও যিক‍্‍র এই বিরতিতে করি। যদি বসে বসে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার পড়ি তাহলে সেটাও অনেক উত্তম যিক‍্‍র হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদেরকে শিরক ও বিদআত মুক্ত দ্বীনের উপর অটল রাখুন।

[উক্ত দুআর ব্যাপারে আপনার দ্বিমত থাকলে বা এই দুআ কোনো হাদীসের কিতাবে কোথাও উল্লেখ থাকলে আমাদেরকে জানাতে পারেন। তা জাল বা জয়ীফ না হলে আমরা ইনশাআল্লাহ আমাদের কনটেন্ট আপডেট করে দিব। দলীল ছাড়া অযথা আমাদের গালমন্দ না করার জন্য আগাম ধন্যবাদ।]

Leave a Reply